অর্থনৈতিক ধীরগতি, কঠোর নীতিমালা, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনা ও তালিকাচ্যুতির আশঙ্কাসহ একাধিক কারণে গত কয়েক বছরে চীনের শেয়ারবাজার থেকে সরে এসেছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। এ বিদেশী বিনিয়োগকারীদের পাশাপাশি অর্থনীতির বিশ্লেষকরাও চীনা শেয়ারবাজারকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘বিনিয়োগ-অযোগ্য’ হিসেবে। তবে সে পরিস্থিতির বড় পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে এখন। চীনা শেয়ারবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ভিড় এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে। খবর রয়টার্স।
চীনা পুঁজিবাজারে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা ফিরতে শুরু করার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক্ষেত্রে মূলত বিনিয়োগ নীতিমালার শিথিলীকরণ ও সহজীকরণ, প্রযুক্তি খাতে নতুন উদ্ভাবন এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মার্কিন সম্পদের বাইরে বিনিয়োগ বৈচিত্র্যায়ণের ক্রমবর্ধমান চাহিদার মতো বিষয়গুলো প্রধান প্রভাবক হিসেবে কাজ করছে।
তাদের ভাষ্যমতে, চীন-মার্কিন বাণিজ্যযুদ্ধ ও ওয়াশিংটনের প্রযুক্তি রফতানি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনে উদ্ভাবন থেমে যায়নি। বিশেষ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রযুক্তির ব্যাপক উন্নয়ন ও গ্রহণযোগ্যতা বাড়ার পাশাপাশি সেমিকন্ডাক্টর ও উদ্ভাবনী ওষুধ শিল্পে উল্লেখযোগ্য মাত্রায় অগ্রগতি দেখিয়েছে চীন এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করেছে।
প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউজে ফেরার পর চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধংদেহী মনোভাব দেখিয়ে আসছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। একপর্যায়ে চীন থেকে আমদানীকৃত পণ্যের ওপর ১৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেন তিনি। কিন্তু বেইজিংয়ের পাল্টা ব্যবস্থা ও কৌশলের কারণে একপ্রকার বাধ্য হয়ে শুল্কবিবাদে বিরতি টানেন ট্রাম্প। বিষয়টিতে দেশটির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত পেয়েছেন বৈশ্বিক বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া সংশ্লিষ্ট নীতিমালা শিথিল করার মাধ্যমে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের মধ্যেও চীনের বিনিয়োগ পরিবেশ নিয়ে আস্থাপূর্ণ মনোভাব তৈরি হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় গত সপ্তাহে চীনের মূল ভূখণ্ডের প্রধান পুঁজিবাজার সূচক সাংহাই কম্পোজিট পৌঁছায় এক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে। আবার মূল ভূখণ্ডের বাইরে হংকংয়ের হ্যাংসেং সূচকও চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতদিন স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা ছিলেন চীনের শেয়ারবাজারের চালিকাশক্তি। বর্তমানে বিদেশীদের মধ্যে বিনিয়োগ আকর্ষণ তৈরি হওয়ায় তা চীনের পুঁজিবাজার আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠার ক্ষেত্রে বড় ধরনের প্রণোদনা হয়ে দেখা দিতে পারে।
নিউইয়র্কভিত্তিক দুটি সিঙ্গেল ফ্যামিলি অফিস পরিচালনা করেন ব্রেট বার্না। তিনি জানান, সম্পদশালীদের মধ্যে এখন বুল মার্কেটে (ঊর্ধ্বমুখী বাজার) বিনিয়োগ নিয়ে আগ্রহ বাড়ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে বিনিয়োগে বৈচিত্র্যায়ণ আনতে চাচ্ছেন তারা। প্রথম সারির বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এরই মধ্যে চীনে ফিরতে শুরু করেছেন।
চীনের আর্থিক বাজার আকর্ষণীয় হয়ে ওঠা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিশ্বের বাকি অংশের ওঠানামা দেশটির শেয়ারবাজারে খুব বেশি একটা প্রভাব ফেলছে না। বিশেষ করে সরকারিভাবে নিয়ন্ত্রিত মূল ভূখণ্ডের প্রধান শেয়ারবাজার (অনশোর এ-শেয়ার) এখন বিনিয়োগকারীদের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠেছে।’
এ সুযোগ কাজে লাগাতে নতুন বিনিয়োগ প্লাটফর্ম তৈরির পরিকল্পনা করছেন ব্রেট বার্না, যা মার্কিন ও ইউরোপীয় মূলধনকে চীনের পুঁজিবাজারে সহজে প্রবেশের সুযোগ দেবে।
মূল ভূখণ্ড ও হংকংসহ মূল ভূখণ্ড-বহির্ভূত অংশ মিলিয়ে চীনা শেয়ারবাজারের টার্নওভার এখন ১৯ ট্রিলিয়ন বা ১৯ লাখ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে চীনের শেয়ারবাজার হয়ে উঠেছে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পুঁজিবাজার। এ বাজারে অর্থের অন্তর্মুখী প্রবাহের ক্রমবর্ধমান ধারাটি এখন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
আর্থিক প্রতিষ্ঠান মরগান স্ট্যানলির প্রতিবেদন অনুসারে, ছয় মাসের মধ্যে আগস্টে বৈশ্বিক হেজ ফান্ডগুলো সবচেয়ে বেশি চীনা শেয়ার কিনেছে।
মর্নিংস্টারের তথ্য অনুযায়ী, চীনকে হিসাবে না নিলে চলতি বছরে উদীয়মান বাজারভিত্তিক নতুন ইকুইটি ফান্ডের সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে আটটিতে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা ছিল ২১। আগের বছর ছিল ১৬টি। সে অনুযায়ী চীন ছাড়া উদীয়মান অন্যান্য বাজারে বিনিয়োগের চাহিদা এখন উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে।
অ্যালিয়াঞ্জ গ্লোবাল ইনভেস্টরসের চায়না ফান্ড ইউনিটের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ঝেং ইউচেং বলেন, ‘এক বছর আগে বিনিয়োগ সূচক থেকে চীনকে বাদ রাখতে চাইতেন বিনিয়োগকারীরা। এখন সেখানকার বিনিয়োগকে দেখা হচ্ছে উপেক্ষা করা সম্ভব নয় এমন একটি স্বতন্ত্র অ্যাসেট ক্লাস হিসেবে।’
২০২৪ সালে অ্যালিয়াঞ্জের উদীয়মান বাজারভিত্তিক পোর্টফোলিওতে চীনে বিনিয়োগের জন্য বরাদ্দ ছিল ২০ শতাংশের নিচে। চলতি বছর তা বেড়ে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির ফান্ড ম্যানেজার জেরি উ বলেন, ‘গত ফেব্রুয়ারিতে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক সম্মেলনে চীনা সেশনে ৫৫ জন ক্লায়েন্ট অংশ নেন, যা ২০২৩ সালের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।’
বিশেষ করে চ্যাটবট ডিপসিকের সাফল্য চীনকেন্দ্রিক উদ্ভাবনী সম্পদগুলোকে পুনর্মূল্যায়নের প্রবণতা তৈরি করেছে বলে জানান জেরি উ। চ্যাটজিপিটির এ প্রতিদ্বন্দ্বী অত্যন্ত কম খরচের এআই মডেল উদ্ভাবন করেছে। এ অগ্রগতি এআই থেকে বায়োটেক ও রোবোটিকস পর্যন্ত সব ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের গতি বাড়িয়ে দিয়েছে।
ক্যামব্রিজ অ্যাসোসিয়েটস চলতি বছর প্রায় ৩০টি ক্লায়েন্ট অনুসন্ধান পেয়েছে, সেখানে চীনকেন্দ্রিক ফান্ড সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। ২০২৩ সালে অনুসন্ধান ছিল সীমিত। বিষয়টি উল্লেখ করে প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ইনভেস্টমেন্ট ডিরেক্টর বেঞ্জামিন লো বলেন, ‘এশিয়ার বাইরে থেকে অনেক বিনিয়োগকারী চীন ও হংকং সফরের পরিকল্পনা করছেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কভিডের পর প্রথমবারের মতো চীনে যাবেন।’
চীনের প্রতি ক্রমবর্ধমান আগ্রহ ঘিরে কিছু সতর্কবার্তাও রয়েছে। কারণ দেশটির আর্থিক বাজারে কিছু দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা রয়ে গেছে। চীনের অর্থনীতি এখনো দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। গত মাসের কারখানা উৎপাদন, খুচরা বিক্রির তথ্য ও অন্যান্য সূচকে বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে।
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) চীনে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই) গত বছরের তুলনায় কমেছে ১৩ দশমিক ২ শতাংশ। এ নাজুক পরিস্থিতির অন্যতম কারণ হলো, চীনের বাজারে প্রাথমিক বিনিয়োগ প্রবেশ করলেও এখনো তা উল্লেখযোগ্য দীর্ঘমেয়াদি মূলধনপ্রবাহে রূপ নেয়নি।
সিএলএসএর প্রধান ইকুইটি স্ট্র্যাটেজিস্ট আলেকজান্ডার রেডম্যান বলেন, ‘চীনে মূল্য সংকোচনজনিত চাপ বিনিয়োগে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
অ্যালিয়াঞ্জ চায়নার পোর্টফোলিও ম্যানেজার চেং ইউ বলছেন, ‘চীনের বাজার সম্পর্কে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখন পুনর্মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছেন। বাজারটিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা রয়েছে কিনা, সেদিকেই তাদের মনোযোগ।’